পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নতুন বার্তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬ , ০৩:২৭ পিএম


পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার নতুন বার্তা
ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি।  ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে টানা ৩৮ দিনের সংঘাত শেষে চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যে এবার পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে নতুন বার্তা এসেছে ইরানের পক্ষ থেকে। সেখানে পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান ঘোষণা করেছেন দেশটির বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। 

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক চাপ ও যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যানের ইঙ্গিত দেন তিনি। খবর এপির।

মার্কিন বার্তাসংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে পাঠ করা এক বিবৃতিতে খামেনি বলেন, পারস্য উপসাগরে আমেরিকানদের থাকার একমাত্র জায়গা হলো ‘পানির তলদেশ’। এই অঞ্চলের ইতিহাসে এক ‘নতুন অধ্যায়’ লেখা হচ্ছে।

মার্কিন আলোচনার বিষয়ে দ্রুত কোনও ফলাফলের প্রত্যাশা করা যুক্তিসঙ্গত নয় বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনাকে তিনি বলেন, মধ্যস্থতাকারী যে-ই হোক না কেন, অল্প সময়ের মধ্যে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রত্যাশা করা আমার মতে খুব একটা বাস্তবসম্মত নয়।

প্রসঙ্গত, ইরানের পরমাণু প্রকল্প এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ।

পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যৌথ হামলার প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্য। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লাগাতার হামলায় প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি, সামরিক বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর শীর্ষ কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপৌরসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হারায় ইরান। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ও ধ্বংস হয় দেশটির বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। সেইসঙ্গে প্রাণ হারায় ইরানের ২ হাজারের বেশি মানুষ।

যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে শক্ত জবাব দেয় ইরানও। যুদ্ধের শুরু থেকেই ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের ৬ দেশ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্তর আরব আমিরাত, ওমানে অবস্থিত মার্কিন সেনাঘাঁটি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে দফায় দফায় ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় দেশটি। ইরানের লাগাতার হামলার মুখে করুণভাবে ভেঙে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও। এ অবস্থায় আবার ইরানের পক্ষে যোগ দেয় লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুতি বাহিনী; যা ইরানের শক্তি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয় যুদ্ধে। এছাড়া, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ইরানের হামলায় ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়ে যায় ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন মিত্ররা। একইসঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ধস নামে মার্কিন তেল বাণিজ্যেও।

এ অবস্থায় ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর জন্য শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের দ্বারস্ত হয় যুক্তরাষ্ট্র। টানা ৩৮ দিন হামলা-পাল্টা হামলার পর গত ৭ এপ্রিল ১৫ দিনের অস্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় দুইপক্ষ। গত ২৩ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত কোনও পক্ষই অন্য পক্ষের ওপর হামলা চালায়নি। তবে, কোনও ধরনের সমঝোতায়ও পৌঁছাতে পারেনি তারা। ফলে, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হরমুজে অবরোধ জারি করে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নৌবাহিনী। এতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে বিশ্ব অর্থনীতি। 

এদিকে আন্তর্জাতিক কয়েকটি গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ বলছে, নতুন করে আবারও যুদ্ধের আশঙ্কা দানা বাঁধতে শুরু করেছে মধ্যপ্রাচ্যে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান— উভয় পক্ষই যার যার অবস্থানে অনড় আছে এখনও; সেইসঙ্গে নিচ্ছে যুদ্ধের প্রস্তুতিও। 

আরও পড়ুন

মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুসারে, সবশেষ যুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম উদ্ধারে জোর তৎপরতা শুরু করেছে তেহরান। একইসঙ্গে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র বের করে আনা হচ্ছে।   

মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসন আবারও সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেই অনুমান থেকেই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে পাল্টা হামলা চালানোর জন্য ইরান দ্রুত তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনর্গঠন করতে চাইছে।

অপরদিকে ইরানে ফের অভিযান চালানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্পও। বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আবার যুদ্ধ শুরু করার প্রয়োজন হতে পারে। এ সংক্রান্ত আলোচনার বিষয়ে আমি এবং হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া আর কেউ কিছু জানেন না।

এমনকি ইরান যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে জার্মানির পর এবার ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। 

তাছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্বরত মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বার্তায় জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত নিজেদের যুদ্ধজাহাজগুলোতে নতুন করে জ্বালানি, খাবার ও গোলাবারুদসহ প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেন্টকমের শেয়ার করা কিছু ছবিতে দেখা যায়, গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ‘ইউএসএস ডেলবার্ট ডি ব্ল্যাক’-এ বিপুল পরিমাণ রসদ তোলা হচ্ছে।

রণতরীটি বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপকে সহায়তা দিচ্ছে।

শুধু তাই নয়, বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ইরান যুদ্ধে নিয়োজিত মার্কিন সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে ডেমোক্র্যাটদের আনা একটি প্রস্তাব নাকচ হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে। আর শুক্রবার (১ মে) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতার ওপর একটি আইনি বাধ্যবাধকতার সময়সীমাও শেষ হতে যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে আরেকটি নতুন যুদ্ধের দিকেই ইঙ্গিত করছে। 

অবশ্য, যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত ইরানে হামলার চিন্তা থেকে পিছিয়ে আসবে কি না, সেটা অনেকটা নির্ভর করছে ট্রাম্পের আসন্ন চীন সফরের ওপর। মে মাসের মাঝামাঝি বেইজিংয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় এই সফরকে ‘অগ্রাধিকার’ দিচ্ছে হোয়াইট হাউজ। এর আগে, যুদ্ধের কারণে একবার এই সফর পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যা দ্বিতীয়বার পেছাতে আগ্রহী নয় ট্রাম্প প্রশাসন।

আরটিভি/এসএইচএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission